মাতৃত্বকালীন ভাতা কত টাকা, পাবেন কীভাবে জেনে নিন

By
Mosabbir Masud
প্রকাশিত:
মাতৃত্বকালীন ভাতা কত টাকা, পাবেন কীভাবে জেনে নিন

দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন সময়ে ও শিশুর লালন-পালনে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকার চালু করেছে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গর্ভবতী মায়েরা প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন।

শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়াই এই কর্মসূচির লক্ষ্য নয়; গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, যত্ন এবং শিশুর প্রাথমিক বিকাশে সহায়তা করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

মাতৃত্বকালীন ভাতা কত টাকা

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় মাসিক ভাতার পরিমাণ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে।

নির্বাচিত উপকারভোগীরা সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সহায়তা পেতে পারেন। অর্থাৎ পুরো ৩৬ মাস মাসিক ৮৫০ টাকা করে পেলে একজন উপকারভোগী মোট পাবেন ৩০ হাজার ৬০০ টাকা

বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের এই কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়।

কারা এই ভাতা পেতে পারেন

সাধারণভাবে আবেদনকারীর ক্ষেত্রে নিচের শর্তগুলো প্রযোজ্য—

  • বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে হবে
  • প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় আবেদন করা যাবে
  • তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে এই কর্মসূচিতে আবেদন করা যাবে না
  • আবেদনকারীর নিজের নামে ব্যাংক হিসাব বা NID-সংযুক্ত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হিসাব থাকতে হবে
  • পারিবারিক মাসিক আয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে
  • স্থানীয় পর্যায়ে নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে

স্থানীয় সরকারি নির্দেশনায় গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট সময়সীমার শর্তও থাকতে পারে। তাই শুধু গর্ভবতী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পাওয়া যায় না। আবেদনকারীর যোগ্যতা, স্থানীয় বরাদ্দ ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।

অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে

‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র জন্য মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের MIS পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যায়। আবেদনকারী নিজে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন, অথবা ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তার সহায়তা নিতে পারেন। নিজের ভোটার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমেও আবেদন করতে হয়।

আবেদনের ধাপ

  1. অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ: সরকারি অনলাইন আবেদন পোর্টালে প্রবেশ করুন
  2. নতুন আবেদন নির্বাচন: ‘নতুন আবেদন (New Application)’ অপশন নির্বাচন করুন
  3. ব্যক্তিগত তথ্য দিন: জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, সচল মোবাইল নম্বর, নাম ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন
  4. অন্যান্য তথ্য পূরণ: গর্ভাবস্থা, সন্তানের তথ্য, পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিন
  5. ছবি ও স্বাক্ষর: প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করুন
  6. তথ্য যাচাই ও জমা: সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ হয়েছে কি না যাচাই করে আবেদন সাবমিট করুন

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আবেদন গ্রহণের সময়সীমা প্রতি মাসের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত হতে পারে। তবে আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সর্বশেষ সময়সূচি জেনে নেওয়া ভালো।

কী কী কাগজপত্র লাগবে

আবেদনের জন্য সাধারণত প্রয়োজন হয়—

  • নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র
  • সচল মোবাইল নম্বর
  • নিজের নামে NID-সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য
  • ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্য
  • গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য বা মেডিকেল রিপোর্ট

আবেদন ও যাচাইয়ের সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইতে পারে।

আবেদন করলেই কি ভাতা নিশ্চিত

না, অনলাইনে আবেদন করলেই কেউ সরাসরি ভাতাভোগী হয়ে যান না। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের MIS ব্যবস্থায় আবেদন গ্রহণের পর প্রাথমিক বাছাই, তথ্য যাচাই, ডাবল-ডিপিং যাচাই, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং চূড়ান্ত বাছাইয়ের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষে যোগ্য আবেদনকারীদের ভাতাভোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

কীভাবে ভাতার টাকা পাবেন

নির্বাচিত উপকারভোগীর নিজস্ব ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হিসাবের মাধ্যমে ভাতার অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই অন্য কারও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার না করে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করাই নিরাপদ।

কোথায় আবেদন করবেন, প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে বিভিন্ন লিংক ছড়িয়ে পড়তে পারে, তবে সব লিংক সরকারি আবেদন পোর্টাল নয়। সমাজসেবা অধিদফতরের বিভিন্ন ভাতা আবেদনের MIS এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র MIS আলাদা। তাই ফেসবুক বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া লিংকে NID বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট কি না নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

মাতৃত্বকালীন ভাতার আবেদন করে দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে বা ভাতা নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে কেউ যদি—

  • OTP চায়
  • NID বা জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি বা তথ্য নিজের ফোনে রাখতে চায়
  • নিজের MFS হিসাবে টাকা পাঠাতে বলে
  • ভাতা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা দাবি করে

—তাহলে তার সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন না করাই নিরাপদ। সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনার জন্য মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং স্থানীয় মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।