সন্তান কথা না শোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন না, এমন অভিভাবক খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে ছোট শিশুরা বারবার একই নিষেধ ভেঙে ফেললে অনেক অভিভাবকই হতাশ হয়ে পড়েন এবং কখনো কখনো শারীরিক শাসনের পথে হাঁটেন। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই সমস্যার সমাধান কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন একজন মুফতি।
প্রশ্নটি যেমন ছিল
ফতোয়া বিভাগে এক অভিভাবক জানতে চান, তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান তার কথা শোনে না। বুঝিয়ে বললেও ভুলে যায়, মারলেও ভুলে যায়—যেমন কোথাও যেতে নিষেধ করলে সে আবার সেখানে যায়, একবার নয় বারবার। তিনি জানতে চান, সন্তানকে কীভাবে কথা শোনাবেন।
মুফতির ব্যাখ্যা: পাঁচ বছর বয়স এখনো পরিপক্ব নয়
ঢাকা বিমানবন্দরের জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস জাওয়াদ তাহের এ প্রসঙ্গে বলেন, ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান—উভয় মতেই পাঁচ বছর বয়সের একটি শিশু পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। এই বয়সের শিশুদের স্মৃতিশক্তি খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। তারা কোনো জেদ বা অবাধ্যতা থেকে অভিভাবকের কথা অমান্য করে না, বরং নতুন কিছু দেখার কৌতূহল তাদের আগের নিষেধ ভুলিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, শিশু মারলেও ভুলে যাওয়াটা আসলে আল্লাহর একটি রহমত—শিশুদের মন খুব স্বচ্ছ হয়, তারা দুঃখ ধরে রাখে না। তবে শাসন যখন শারীরিক হয়, তখন শিশু শিখতে পারে না, বরং আরও জেদি বা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
রাসূল (সা.)-এর আদর্শ
মুফতি জাওয়াদ তাহের রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণকে এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। হজরত আনাস (রা.)-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ দশ বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেও তিনি কখনো তার কোনো কাজের জন্য বিরক্তিসূচক কোনো শব্দ শোনেননি কিংবা কোনো কাজ কেন করলেন বা করলেন না—এমন প্রশ্নও শোনেননি (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গে খেলতেন, তারা তার পিঠে চড়তেন। তিনি শিশুদের মারার পরিবর্তে আদর ও দোয়ার মাধ্যমে সংশোধন করতেন। মুফতির ভাষায়, পাঁচ বছর বয়স শাসনের নয়, বরং গভীর মমতা ও বন্ধুত্বের বয়স।
ধৈর্যের পরীক্ষা হিসেবে দেখার পরামর্শ
মুফতি জাওয়াদ তাহের বলেন, সন্তানের অবাধ্যতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিভাবকের ধৈর্যের একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। অনেক সময় বান্দাকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দেওয়ার জন্য আল্লাহ এমন কিছু পরীক্ষা দেন, যা তার মনের মতো হয় না। তিনি বলেন, অভিভাবক হয়তো চান সন্তান রোবটের মতো সব কথা শুনুক, কিন্তু আল্লাহ চান অভিভাবক নিজের শাসনের পদ্ধতি পরিবর্তন করুন।
মুফতির দেওয়া ছয়টি পরামর্শ
মুফতি জাওয়াদ তাহের সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো দিয়েছেন—
১. মারধর একদম বন্ধ করুন। পাঁচ বছর বয়সের শিশুকে মারলে তার হিতে বিপরীত হয়, সে জেদি হয়ে ওঠে অথবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ইসলামে শিশুকে নামাজের জন্য শাসন করতে বলা হয়েছে সাত বছর বয়সে, তাও খুব মৃদুভাবে। পাঁচ বছর বয়সে মারা শরিয়তসম্মত নয়।
২. চোখের সমান উচ্চতায় বসে বোঝান। কোনো কিছু নিষেধ করার সময় দূর থেকে চিৎকার না করে শিশুর উচ্চতায় হাঁটু গেড়ে বসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বুঝিয়ে বলা উচিত।
৩. ভালো কাজের প্রশংসা করুন। শিশু যখন কোনো ভালো কাজ করে বা একবার কথা শোনে, তখন তাকে প্রশংসা ও পুরস্কার দিলে সে ভবিষ্যতে কথা শুনতে উৎসাহিত হয়।
৪. নিয়মিত দোয়া করুন। সন্তানের জন্য প্রতিদিন সিজদায় বা নামাজের পর সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি পড়ার পরামর্শ দেন তিনি— রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিন ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।
৫. ঘুমন্ত অবস্থায় সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিন। শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকে বা শান্ত থাকে, তখন তার মাথায় হাত রেখে সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়ে আল্লাহর কাছে তার হেদায়েত কামনা করা যেতে পারে।
৬. নিজের আচরণে উদাহরণ তৈরি করুন। শিশু উপদেশ শুনে নয়, দেখে শেখে। তাই অভিভাবককে নিজের আচরণ ও ইবাদতের মাধ্যমে সন্তানের সামনে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
ভালোবাসাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান
মুফতি জাওয়াদ তাহের পরামর্শের শেষে বলেন, সন্তানের প্রতি রাগের পরিবর্তে করুণা প্রদর্শন করা উচিত। সে যখন কথা শুনবে না, তখন তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করাই ভালো, কারণ ভালোবাসা দিয়ে যা সম্ভব, ভয় দেখিয়ে তা সম্ভব নয়।
প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. পাঁচ বছর বয়সী শিশু কথা না শুনলে তাকে মারা কি ইসলামে অনুমোদিত? না, মুফতি জাওয়াদ তাহেরের মতে পাঁচ বছর বয়সে শিশুকে মারা শরিয়তসম্মত নয়; ইসলামে শাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সাত বছর বয়সে, তাও খুব মৃদুভাবে।
২. শিশু বারবার একই নিষেধ ভাঙে কেন? এই বয়সের শিশুদের স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী হয় এবং নতুন কিছু দেখার কৌতূহল তাদের আগের নিষেধ ভুলিয়ে দেয়—এটি জেদ বা অবাধ্যতা নয়।
৩. রাসূল (সা.) শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতেন? হজরত আনাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো তার কোনো কাজের জন্য বিরক্তি প্রকাশ করেননি, বরং তিনি শিশুদের সঙ্গে খেলতেন ও আদর-স্নেহে সংশোধন করতেন।
৪. সন্তানের জন্য কোন দোয়া পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে? সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি প্রতিদিন সিজদায় বা নামাজের পর পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন মুফতি জাওয়াদ তাহের।
৫. শিশুকে কথা শোনানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী? চিৎকার বা মারধরের পরিবর্তে চোখের সমান উচ্চতায় বসে নরম স্বরে বোঝানো, ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং ভালোবাসা দেখানোই সবচেয়ে কার্যকর বলে জানান মুফতি।

