শিশুর জন্মনিবন্ধন করাবেন যেভাবে, যেসব কাগজপত্র লাগবে

সন্তানের জন্মের পর চিকিৎসাসেবা, নাম রাখা আর পরিচর্যা নিয়েই সাধারণত ব্যস্ত সময় কাটে বাবা-মায়ের। এই ব্যস্ততার মাঝে অনেক সময়ই জন্মনিবন্ধনের বিষয়টি পেছনের সারিতে চলে যায়। অথচ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুর জন্মের পর প্রথম …

Avatar
Written By : Mosabbir Masud

Updated Now:

বুকমার্ক Prefer Masudwap on Google
শিশুর জন্মনিবন্ধন করাবেন যেভাবে, যেসব কাগজপত্র লাগবে
শিশুর জন্মনিবন্ধন করাবেন যেভাবে, যেসব কাগজপত্র লাগবে

সন্তানের জন্মের পর চিকিৎসাসেবা, নাম রাখা আর পরিচর্যা নিয়েই সাধারণত ব্যস্ত সময় কাটে বাবা-মায়ের। এই ব্যস্ততার মাঝে অনেক সময়ই জন্মনিবন্ধনের বিষয়টি পেছনের সারিতে চলে যায়। অথচ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুর জন্মের পর প্রথম দিকেই এই আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলা জরুরি।

জন্মনিবন্ধন কেবল একটি কাগজ বা সনদ সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি শিশুর নাগরিক পরিচয়ের প্রথম সরকারি স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাজে জন্মনিবন্ধন অপরিহার্য। তাই শেষ মুহূর্তের জটিলতা এড়াতে সঠিক নিয়মে যত দ্রুত সম্ভব আবেদন করা উচিত।

শিশুর জন্মের কত দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হবে?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ৮(১) ধারা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই দায়িত্ব শিশুর পিতা, মাতা, আইনগত অভিভাবক বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যক্তির।

আইন নির্ধারিত এই ৪৫ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে জন্মের পরপরই হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ।

দ্রুত জন্মনিবন্ধন করানোর সুবিধা

১. সহজে তথ্য যাচাই: জন্মের পরপরই হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ছাড়পত্র, জন্মতারিখ ও স্থানের সঠিক তথ্য সাম্প্রতিক কাগজপত্রের সঙ্গে সহজে মিলিয়ে দেখা যায়।

২. ভবিষ্যতের জটিলতা এড়ানো: বিদ্যালয়ে ভর্তি বা চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনে শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে আবেদন করার ঝামেলা পোহাতে হয় না।

৩. ভুল সংশোধনের ঝুঁকি কমে: প্রাথমিক পর্যায়ে সতর্কতার সঙ্গে আবেদন করলে বাংলা ও ইংরেজি নামের বানান, জন্মতারিখ কিংবা ঠিকানায় ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

আবেদনের ওয়েবসাইট ও নিয়ম

বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুর জন্মনিবন্ধনের প্রাথমিক আবেদন পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়।

  • অনলাইন পোর্টাল: জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট bdris.gov.bd/br/application-এ প্রবেশ করে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে।

  • কার্যালয় নির্বাচন: সাধারণত শিশুর জন্মস্থান অথবা স্থায়ী ঠিকানার আওতাধীন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয় নির্বাচন করতে হয়।

  • তথ্য পূরণ: ফরমে শিশুর পূর্ণ নাম (বাংলা ও ইংরেজি), জন্মতারিখ, লিঙ্গ, পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর এবং স্থায়ী-বর্তমান ঠিকানা নির্ভুলভাবে লিখতে হবে।

  • কাগজপত্র জমা: অনলাইনে সফলভাবে আবেদন সাবমিট করার পর অ্যাপ্লিকেশন ফর্মটি প্রিন্ট নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রসহ নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে নির্বাচিত কার্যালয়ে সশরীরে জমা দিতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও শিশুর বয়সের ওপর ভিত্তি করে কাগজপত্রের কিছুটা ভিন্নতা হতে পারে। তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যেসব কাগজপত্র হাতের কাছে রাখা আবশ্যক:

  • হাসপাতাল, ক্লিনিক বা নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া ইপিআই কার্ড বা জন্মসংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র।

  • বাবা ও মায়ের ডিজিটাল (১৭ ডিজিটের) জন্মনিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।

  • স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে ইউটিলিটি বিলের কপি, হোল্ডিং ট্যাক্স রসিদ বা জমির খতিয়ান/দলিলের কপি।

  • আবেদনকারীর সচল মোবাইল নম্বর (ওটিপি ও স্ট্যাটাস যাচাইয়ের জন্য)।

৪৫ দিন পার হয়ে গেলে করণীয়

নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন করতে না পারলে সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী বিলম্বিত নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সরকারি বিলম্ব ফি প্রদান এবং ক্ষেত্রবিশেষে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র দাখিল করতে হতে পারে। তাই বিলম্ব হয়ে গেলেও দেরি না করে নিকটস্থ নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে নির্দেশনা নেওয়া উচিত।

শিশুর নাম চূড়ান্ত না হলে কি আবেদন করা যাবে?

আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধনের আগেই শিশুর নাম চূড়ান্ত করার বিধান রয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে নাম ঠিক করা সম্ভব না হলেও জন্মসংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধনের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর পূর্ণ নাম সরবরাহ করতে হবে।

বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকলে কী করণীয়?

সন্তানের অনলাইন জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে বাবা-মায়ের ডিজিটাল সনদ না থাকায় অনেক সময় অভিভাবকরা ভোগান্তিতে পড়েন। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাবা-মায়ের বয়স ও পরিচয়ের সরকারি নথি (যেমন: শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট) প্রদর্শন করে তাঁদের নিবন্ধন দ্রুত হালনাগাদ করে নেওয়া যায়। এ ধরনের জটিলতায় সরাসরি স্থানীয় নিবন্ধকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

আবেদন যাচাইয়ের জরুরি বিষয়গুলো

অনলাইন ফরম চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে বিষয়গুলো পুনরায় দেখে নেওয়া প্রয়োজন:

  • নামের বাংলা ও ইংরেজি বানানে কোনো গরমিল আছে কি না।

  • জন্মতারিখ ও হাসপাতাল সনদের তারিখ হুবহু এক কি না।

  • পিতা-মাতার নামের বানান তাঁদের পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলছে কি না।

  • সঠিক আঞ্চলিক বা ওয়ার্ড কার্যালয় নির্বাচন করা হয়েছে কি না।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQs)

প্রশ্ন ১: শিশুর জন্মের কত দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হয়?

উত্তর: জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ৮(১) ধারা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্মসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন ২: ৪৫ দিন পার হয়ে গেলে কি শিশুর জন্মনিবন্ধন করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ৪৫ দিন পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধনের সুযোগ থাকে। আইন অনুযায়ী বিলম্বিত নিবন্ধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত সরকারি ফি ও প্রয়োজনীয় কিছু যাচাইকরণ নথি জমা দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করা যায়।

প্রশ্ন ৩: শিশুর জন্মনিবন্ধনের জন্য কোন ওয়েবসাইটে আবেদন করতে হয়?

উত্তর: অনলাইনে শিশুর জন্মনিবন্ধনের জন্য সরকারের কেন্দ্রীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ওয়েবসাইট bdris.gov.bd/br/application-এ গিয়ে আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়।

প্রশ্ন ৪: শিশুর নাম চূড়ান্ত না থাকলে কি জন্মনিবন্ধনের আবেদন করা সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ, আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী নাম চূড়ান্ত না থাকলেও প্রাথমিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন শুরু করা যায়। তবে নিবন্ধনের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর পূর্ণ নাম অবশ্যই নিবন্ধকের কাছে জমা দিতে হবে।

প্রশ্ন ৫: বাবা-মায়ের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন না থাকলে কি সন্তানের জন্মনিবন্ধন করা যাবে?

উত্তর: সন্তানের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের ডিজিটাল (১৬/১৭ ডিজিটের) জন্মনিবন্ধন থাকা আবশ্যক। তাঁদের নিবন্ধন না থাকলে বয়স প্রমাণের নথি (যেমন শিক্ষাগত সনদ বা এনআইডি) দিয়ে প্রথমে তাঁদের নিবন্ধন হালনাগাদ করে নিতে হবে।

Related Posts

More from ইনফো

সঙ্গে থাকুন ➥