ঘুম কম হলে পুরুষের শরীরে যেসব প্রভাব পড়ে

দিনের শুরুতে ক্লান্তি, কাজে মনোযোগের অভাব কিংবা খিটখিটে মেজাজ—পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার চেনা উপসর্গ এগুলো। তবে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি শুধু দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, …

Avatar
Written By : Mosabbir Masud

Updated Now:

বুকমার্ক Prefer Masudwap on Google
ঘুম কম হলে পুরুষের শরীরে যেসব প্রভাব পড়ে
ঘুম কম হলে পুরুষের শরীরে যেসব প্রভাব পড়ে

দিনের শুরুতে ক্লান্তি, কাজে মনোযোগের অভাব কিংবা খিটখিটে মেজাজ—পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার চেনা উপসর্গ এগুলো। তবে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি শুধু দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, হরমোন নিঃসরণ ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন হরমোন এবং যৌনস্বাস্থ্যের সঙ্গে ঘুমের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত। তাই রাত জাগার অভ্যাস বা ঘুমের অবহেলাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে গড়ে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে কম ঘুম হলে পুরুষের শরীরে মূলত যেসব জটিলতা তৈরি হতে পারে:

১. টেস্টোস্টেরন হরমোনে প্রভাব

পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা, পেশি গঠন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের মূল চালিকাশক্তি হলো টেস্টোস্টেরন হরমোন। গভীর ঘুমের সময়ই শরীর এই হরমোনের সিংহভাগ নিঃসরণ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী জামা (JAMA)-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পুরুষের দিনের বেলার টেস্টোস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। যদিও ব্যক্তিভেদে এই প্রভাব ভিন্ন হতে পারে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটায়।

২. যৌনস্বাস্থ্যের অবনতি ও ক্লান্তি

ঘুমের অভাবে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি পুরুষের যৌনাকাঙ্ক্ষা (Libido) কমিয়ে দিতে পারে। তবে যৌনজীবনে যেকোনো সমস্যার পেছনে কেবল কম ঘুমই একমাত্র কারণ নাও হতে পারে; ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপও এর জন্য দায়ী হতে পারে। তাই এমন সমস্যায় ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৩. ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

ঘুমের ঘাটতি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী দুটি প্রধান হরমোন—লেপটিন ও ঘ্রেলিনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে বেশি ক্ষুধা লাগে এবং বিশেষ করে মিষ্টি ও শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা ওজন বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া কম ঘুম শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।

৪. হৃদ্‌রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি

ঘুমের সময় হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালি স্বাভাবিক বিশ্রামের সুযোগ পায় এবং রক্তচাপ কিছুটা কমে আসে। দিনের পর দিন অপর্যাপ্ত ঘুম হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

৫. মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও কর্মক্ষমতা হ্রাস

মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতি ধরে রাখার জন্য গভীর ঘুম অপরিহার্য। ঘুমের ঘাটতি থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীর হয়ে যায় এবং মনোযোগে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে ভুলের সংখ্যা বাড়ে। বিশেষ করে গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঘুমের ঘাটতি মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

৬. মানসিক অস্থিরতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া

ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন) ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) দুর্বল হয়ে পড়ে। নিয়মিত না ঘুমালে শরীর প্রয়োজনীয় সাইটোকাইনস প্রোটিন তৈরি করতে পারে না, ফলে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

৭. দিনের বেলা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া

সারারাত বিছানায় কাটানোর পরও যদি সকালে সতেজ না লাগে বা সারাদিন ঝিমুনি আসে, তবে তা সাধারণ ঘুমের অভাব নাও হতে পারে। এটি অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার (ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া) মতো জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে। ঘুমের মধ্যে বিকট শব্দে নাক ডাকা এবং শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার সমস্যা থাকলে দ্রুত পালমোনোলজিস্ট বা স্লিপ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।

পুরুষের বয়সভেদে ঘুমের প্রয়োজন কতটুকু?

  • ১৮ থেকে ৬০ বছর: প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা বা তার বেশি।

  • ৬১ থেকে ৬৪ বছর: প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা।

  • ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব: প্রতি রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।

ভালো ঘুমের জন্য করণীয়

  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

  • শোবার ঘরে আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ করে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করুন।

  • ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা যেকোনো ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করুন।

  • বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা, কফি বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।

  • হরমোনের ঘাটতি সন্দেহে নিজে নিজে বাজারে প্রচলিত কোনো টেস্টোস্টেরন বুস্টার বা ওষুধ সেবন করবেন না।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQs)

প্রশ্ন ১: পুরুষের প্রতিদিন গড়ে কত ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন?

উত্তর: স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সুস্থ থাকতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন।

প্রশ্ন ২: ঘুম কম হলে কি সত্যিই পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ঘুমের নির্দিষ্ট পর্যায়ে শরীর টেস্টোস্টেরন নিঃসরণ করে। পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত ঘুম না হলে দিনের বেলায় এই হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন ৩: ঘুমের ঘাটতি কি রক্তে শর্করার মাত্রা ও ডায়াবেটিস বাড়াতে পারে?

উত্তর: নিয়মিত কম ঘুমালে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রশ্ন ৪: রাতে ঘুমানোর পরও দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পেলে কী করণীয়?

উত্তর: দীর্ঘ সময় বিছানায় থেকেও সতেজ না লাগলে এবং তীব্র নাক ডাকার সমস্যা থাকলে এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিজে নিজে ঘুমের ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

Related Posts

সঙ্গে থাকুন ➥