দেশের কৃষি খাতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত পাঁচ বছরে দেশে কীটনাশক ব্যবহার প্রায় ৮১.৫ শতাংশ বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৩৯,০০০ থেকে ৪৫,০০০ মেট্রিক টনের বেশি রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশের বালাইনাশক খাতকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কোন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে
গবেষণায় উঠে এসেছে, আলু, বেগুন ও বোরো ধান চাষে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়। উত্তরবঙ্গের শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পোকার আক্রমণ বাড়ায় কৃষকরা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি কীটনাশক ছিটাচ্ছেন।
নরসিংদী, সাভার, টাঙ্গাইল ও শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে নিবিড় সবজি চাষের কারণে কীটনাশকের ব্যবহার আরও তীব্র। বিশেষ করে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও বেগুন চাষে এক মৌসুমে ১৭ থেকে ১৫০ বার পর্যন্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ফসল তোলার আগের নির্ধারিত সময়সীমা (Pre-Harvest Interval) মানা হচ্ছে না।
উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে টমেটো ও তরমুজ চাষেও সম্প্রতি রাসায়নিকের ব্যবহার বেড়েছে। তবে সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে জৈব-কীটনাশক ও ফেরোমন ট্রাপের ব্যবহার কিছুটা বাড়তির দিকে, যা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চা-বাগান এবং শীতকালীন সবজি চাষেও কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। পার্বত্য ও হাওর অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর ভাষ্যমতে, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাহাড়ি বুনো সবজি এবং হাওরের দেশীয় মাছ ও ওষুধি গাছ বিলুপ্তির পথে।
কমিটির কার্যপরিধি
কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান বালাইনাশক আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়ন, বালাইনাশক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুপারিশ প্রণয়ন। আগামী তিন মাসের মধ্যে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ দেবে কমিটি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপকরণ-২ শাখা থেকে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। উপসচিব মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, বালাইনাশকের আমদানি, উৎপাদন, ব্যবহার ও গুণগতমান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিবন্ধন, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো, গবেষণাগারের কার্যক্রম এবং মনিটরিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে খাতটিকে সময়োপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিতে কারা থাকছেন
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সদস্য-সচিব হিসেবে থাকবেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। এ ছাড়া কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিকিৎসা ও পরিবেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের কো-অপ্ট করার ক্ষমতাও থাকবে কমিটির।
প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কেন কৃষি মন্ত্রণালয় বালাইনাশক খাত সংস্কার কমিটি গঠন করেছে? জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে কীটনাশক ব্যবহার গত পাঁচ বছরে প্রায় ৮১.৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২. কমিটিতে কতজন সদস্য রয়েছেন এবং কারা নেতৃত্বে থাকছেন? কমিটিতে মোট ১৯ জন সদস্য রয়েছেন। আহ্বায়ক হিসেবে থাকবেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সদস্য-সচিব হিসেবে থাকবেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
৩. কমিটি কত সময়ের মধ্যে সুপারিশ জমা দেবে? আগামী তিন মাসের মধ্যে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ দেবে কমিটি।
৪. দেশের কোন অঞ্চলে কীটনাশক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি? উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল এবং নরসিংদী, সাভার, টাঙ্গাইল ও শেরপুর-ময়মনসিংহের নিবিড় সবজি চাষ অঞ্চলে কীটনাশক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি।
৫. অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব কী? অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাহাড়ি বুনো সবজি এবং হাওরের দেশীয় মাছ ও ওষুধি গাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে বলে স্থানীয় সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আশা, কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বালাইনাশকের নিরাপদ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।

আপনার মতামত লিখুন :