শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চামড়া ওঠা কিংবা ঠোঁটের কোণে ফাটল দেখা দেওয়া খুবই সাধারণ সমস্যা। ঠান্ডা বাতাস, বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়া, বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানো এবং সুরক্ষা ছাড়া বাইরে থাকার কারণে ঠোঁটের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ঠোঁট এতটাই শুষ্ক হয়ে যায় যে হাসতে, কথা বলতে কিংবা খেতেও অস্বস্তি হয়।
সংক্ষেপে উত্তর: শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করতে নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি বা সুগন্ধিবিহীন ঘন লিপ বাম ব্যবহার করুন, ঠোঁট চাটা বন্ধ করুন এবং ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখুন। ঠোঁট বারবার ফাটলে, রক্ত পড়লে বা দীর্ঘদিনেও না সারলে অন্য কারণ আছে কি না, তা-ও দেখা দরকার।
শীতে ঠোঁট ফাটে কেন?
ঠোঁটের ত্বক মুখের অন্যান্য অংশের তুলনায় পাতলা এবং এতে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি নেই। ফলে ঠোঁট আর্দ্রতা হারালে দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
সাধারণ কারণগুলো:
- ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস ঠোঁটের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়।
- বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালে লালা শুকিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে।
- ঠোঁট কামড়ানো, চামড়া টেনে তোলা এবং সুগন্ধি বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন প্রসাধনী ব্যবহার।
- মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু ত্বকের সমস্যা।
এক নজরে: করণীয় ও বর্জনীয়
| করবেন | করবেন না |
|---|---|
| সুগন্ধিবিহীন পেট্রোলিয়াম জেলি বা লিপ বাম লাগান | ঠোঁট জিভ দিয়ে ভেজাবেন না |
| বাইরে যাওয়ার আগে লিপ বাম লাগান | শুকনো চামড়া টেনে তুলবেন না |
| রোদে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি লিপ বাম ব্যবহার করুন | স্ক্রাব দিয়ে ঘষবেন না |
| ঘুমানোর আগে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগান | মেনথল, কর্পূর, সুগন্ধি বা স্বাদযুক্ত পণ্য ব্যবহার করবেন না |
| ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন | লেবুর রস, টুথপেস্ট, লবণ বা চিনি লাগাবেন না |
শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার ৭টি কার্যকর উপায়
১. নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন
পেট্রোলিয়াম জেলি ঠোঁটের ওপর সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। দিনে কয়েকবার, বিশেষ করে খাওয়ার পর, মুখ ধোয়ার পর এবং ঘুমানোর আগে লাগাতে পারেন। ঠোঁট খুব শুষ্ক হলে আরও ঘন ঘন ব্যবহার করা যায়।
সুগন্ধি ও স্বাদযুক্ত উপাদানবিহীন সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি বেছে নিন। এতে সংবেদনশীল ঠোঁটে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি কম থাকে।
২. ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজাবেন না
ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেন। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও পরে ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে। লালার উপাদান এবং লালা শুকিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ঠোঁটের সুরক্ষামূলক স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই জিভ দিয়ে ভেজানোর বদলে লিপ বাম বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন। ঠোঁট কামড়ানো ও শুকনো চামড়া টেনে তোলার অভ্যাসও ছাড়তে হবে।
৩. ঠান্ডা বাতাস ও রোদ থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখুন
শীতের সকালে বা রাতে বাইরে বের হলে ঠোঁট সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। বের হওয়ার আগে সুরক্ষামূলক লিপ বাম লাগান। প্রয়োজনে স্কার্ফ দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখুন।
রোদেলা শীতের দিনেও যত্ন জরুরি। বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে সূর্যরশ্মিতে ঠোঁট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার লিপ বাম ব্যবহার করা ভালো।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি হলে ঠোঁটসহ বিভিন্ন অংশে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে, তাই শীতেও নিয়মিত পানি পান করা দরকার। তবে ঠোঁট ফাটার সব কারণ পানিশূন্যতা নয়। পানির ঘাটতি না থাকলেও ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা বা ঠোঁটের সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠোঁট ফাটতে পারে।
তাই শুধু বেশি পানি পান করলেই ঠোঁট ফাটা বন্ধ হবে, এমন ভাবা ঠিক নয়। পানি পানের পাশাপাশি লিপ বাম ব্যবহার করুন।
৫. জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্য এড়িয়ে চলুন
সব লিপ বাম সমান উপযোগী নয়। কিছু পণ্যের সুগন্ধি, স্বাদযুক্ত উপাদান বা নির্দিষ্ট রাসায়নিক ঠোঁটে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে ঠোঁট আগে থেকে ফেটে থাকলে।
- লিপ বাম লাগানোর পর জ্বালা, চুলকানি বা অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
- মেনথল, কর্পূর, ইউক্যালিপটাস, সুগন্ধি এবং পুদিনা বা দারুচিনির স্বাদযুক্ত পণ্য সংবেদনশীল ঠোঁটে সমস্যা বাড়াতে পারে।
- সুগন্ধিবিহীন ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে না, এমন পণ্য বেছে নিন।
৬. ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক হতে দেবেন না
শীতে ঘরের বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলে ঠোঁটের শুষ্কতা বাড়তে পারে। শুষ্ক পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকলে বা রাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলে ঠোঁট বেশি ফাটতে পারে।
- ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যন্ত্রটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন, যাতে জীবাণু বা ছত্রাক না জমে।
- ঘুমানোর আগে ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগালে ঘুমের সময় আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য হয়।
৭. ঠোঁটের শুকনো চামড়া টেনে তুলবেন না
ঠোঁট ফাটলে অনেকে শুকনো চামড়া হাত দিয়ে তুলে ফেলেন। এতে নতুন ক্ষত তৈরি হতে পারে, রক্ত পড়তে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।
চামড়া উঠতে শুরু করলে টেনে না তুলে নিয়মিত লিপ বাম লাগান। ঠোঁট খুব শুষ্ক থাকলে স্ক্রাব দিয়ে ঘষাঘষিও এড়িয়ে চলুন, এতে ঠোঁটের ওপরের ত্বক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কয়েক দিন যত্ন নেওয়ার পরও অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঠোঁট ফাটা দ্রুত সারাতে কোন লিপ বাম ব্যবহার করবেন?
এমন লিপ বাম বেছে নিন, যা আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং জ্বালাপোড়া তৈরি করে না। সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি, সিরামাইড বা ডাইমেথিকোনযুক্ত সুগন্ধিবিহীন পণ্য উপকারী হতে পারে। ব্যবহারের পর জ্বালা বা অস্বস্তি হলে বন্ধ করুন।
ঘরোয়া উপাদান নিয়ে সতর্কতা: ঠোঁট ফাটা অবস্থায় লেবুর রস, টুথপেস্ট, লবণ বা চিনি দিয়ে ঘষা কিংবা অন্যান্য ঘরোয়া উপাদান সরাসরি লাগাবেন না। এগুলো সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে।
ঠোঁট ফাটা কত দিনে ভালো হয়?
সাধারণ শুষ্কতায় নিয়মিত যত্নে কয়েক দিনের মধ্যে উন্নতি দেখা যেতে পারে। তবে ফাটল গভীর হলে, অথবা বারবার ঠোঁট চাটা, ঠান্ডা বাতাস বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্যের সংস্পর্শ চললে সারতে বেশি সময় লাগতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
| লক্ষণ | করণীয় |
|---|---|
| ঠোঁট অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া | চিকিৎসকের পরামর্শ নিন |
| গভীর ফাটল থেকে রক্ত পড়া | চিকিৎসকের পরামর্শ নিন |
| পুঁজ বা সংক্রমণের লক্ষণ | চিকিৎসকের পরামর্শ নিন |
| ঠোঁটের কোণে বারবার ফাটল | কারণ পরীক্ষা করান |
| দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারা বা বারবার ফিরে আসা | চিকিৎসকের পরামর্শ নিন |
| ঠোঁটে দীর্ঘদিন খসখসে দাগ, ক্ষত বা পরিবর্তন | চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন |
দীর্ঘস্থায়ী ঠোঁটের প্রদাহ, অ্যালার্জি, কিছু পুষ্টির ঘাটতি কিংবা অন্য ত্বকের সমস্যার কারণেও ঠোঁট ফাটতে পারে। তাই সব ক্ষেত্রে শীতের শুষ্কতাকেই একমাত্র কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। ব্যক্তিভেদে সমস্যা ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী? নিয়মিত সুগন্ধিবিহীন পেট্রোলিয়াম জেলি বা উপযোগী লিপ বাম ব্যবহার করা, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা এবং ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখা সবচেয়ে কার্যকর উপায়ের মধ্যে রয়েছে।
ঠোঁট ফাটলে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যাবে? হ্যাঁ। সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে। দিনে কয়েকবার ও ঘুমানোর আগে লাগানো যেতে পারে।
পানি কম পান করলে কি ঠোঁট ফাটে? শরীরে পানির ঘাটতি ঠোঁটের শুষ্কতায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা ও ঠোঁট চাটার অভ্যাসও সাধারণ কারণ। তাই শুধু পানি বাড়ালেই সব ক্ষেত্রে সমস্যা দূর হয় না।
ঠোঁট ফাটা ভালো হতে কত দিন লাগে? সাধারণ শুষ্কতায় নিয়মিত যত্নে কয়েক দিনের মধ্যে উন্নতি হতে পারে। দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারলে বা সমস্যা বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঠোঁট ফাটলে কোন কাজগুলো করা উচিত নয়? ঠোঁট চাটা, শুকনো চামড়া টেনে তোলা, স্ক্রাব দিয়ে ঘষা এবং জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন লিপ বাম ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন।
শেষ কথা
শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করতে দামি প্রসাধনী সব সময় লাগে না। নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি লাগানো, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা, ঠান্ডা বাতাস থেকে সুরক্ষা নেওয়া এবং জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্য এড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ঠোঁট না সারলে বা সমস্যা বারবার ফিরে এলে সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

